ফটোগ্রাফি বাড়াচ্ছে ফেসবুক - SRLOVEBD

মেতে উঠুন প্রযুক্তির সুরে

Saturday, 16 January 2016

ফটোগ্রাফি বাড়াচ্ছে ফেসবুক

ছবি তোলার প্রবণতা বাঙালির নতুন কিছু নয়। সেটা নিয়ে তর্কেরও তাই অবকাশ নেই। তর্কটা হল, ফেসবুকে ওই ছবি দিয়ে নিজেকে তোলা নিয়ে! যাকে দেখো, সেই এখন সযত্নে প্রায় চব্বিশ ঘন্টায় যা যা করছে, সবেরই টুক করে একটা ছবি ফেসবুকে তুলে দেয়। একটা বাচ্চা জন্মানোর পর চোখ খুলেছে কি খোলেনি, তার বাবা ছানার মুখের ওপর ফ্ল্যাশ ফেলে ছবি চালান করে দেয় ফেসবুকে। স্বামীরা চান করতে গেলে বউরা তক্কে তক্কে থাকে, কখন বেরোবে আর তার একটা অপ্রস্তুত অবস্থার ছবি তুলে দেয়া যাবে ফেসবুকে। এছাড়া রেস্তোরাঁ থেকে আমবাগান, শপিং মল থেকে চায়ের দোকান, কান একটু খাড়া রাখলেই শুনে ফেলতে পারেন ‘সে  চিইইজ’ অথবা ‘স্মাইল প্লিজ’!

সবার হাতেই এখন ছোট-বড়-মাঝারি সাইজের ক্যামেরা। আর তা না থাকলেও মোবাইল ফোনের ক্যামেরা তো আছেই। তাতে বরং সুবিধে আরও বেশি, ছবি তুলেই কোনো কোনো ফোন থেকে যে সেটাকে সটান তুলে দেয়া যায় ফেসবুকে। সব ক্যামেরা ফোনই এখন এই সুবিধা যন্ত্রে আনতে বাধ্য হচ্ছে। ফেসবুকে এই প্রতিটি মুহূর্ত ধরে রাখার প্রবণতায় আপ-টু-ডেট হচ্ছে ক্যামেরাও। অনেক ক্যামেরাতেই এখন থাকছে ফেসবুক শেয়ার অপশন। এভাবেই এখন নিত্যদিন চলছে বাঙালির ফটোগ্রাফি। কখনও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখটাকে একটু অ্যাঙ্গেল করে, কখনও চুল পরিপাটি করে ছাদে দাঁড়িয়ে, কখনও বা কাঁটা চামচে করে নুডলস মুখে পুরতে পুরতে।

গোখেল কলেজের ছাত্রী রিয়া যেমন অবসর সময়ে ঘরেই একটু সাজগোজ করে, মাকেই বলে কয়েকটা ছবি তুলে দিতে! ‘প্রত্যেক সপ্তাহে ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার চেঞ্জ না করলে চলে না রিয়ার’, বিরক্ত হয়ে অভিযোগ করছিলেন রিয়ার মা দেবস্মিতা। সঙ্গে সঙ্গে চটজলদি সাফাই নিয়ে তৈরি মেয়ে। ‘ছবির কালেকশন ফেসবুকে ভালো না থাকলে চলে? এখন আর কেউ কষ্ট করে স্টেটাস পড়তে চায় না, সবাই দেখতে চায় ছবি। আমরা তো বন্ধুরা কম্পিটিশনও করি, কার ছবি কত বেশি লাইক আর কমেন্ট পেল’, জানাল রিয়া। হিন্দু স্কুলের ক্লাস নাইনের রৌনক আবার সামনে মা না থাকলেই চুলটা একটু স্পাইক করে মোবাইলে তুলে ফেলে নিজের কিছু খাসা ছবি। তেমনই বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে খাবারের প্লেটের ছবিও তুলে আপলোড করে দেয় ফেসবুকে।

সত্যি! মাত্র সাত আট বছরে ফেসবুকের দৌলতে প্রায় সব বাঙালিই বেশ ফটোগ্রাফার হয়ে উঠল, না? কয়েক বছর আগের চিত্রটা কেমন আমূল পাল্টে গেল! কিছু বছর আগেও আমাদের মধ্যে সেজেগুজে নদী-পাহাড়ের ব্যাকগ্রাউন্ডওয়ালা স্টুডিওয় দাঁড়িয়ে ছবি তোলার রেওয়াজ ছিল। তাও আবার বছরের বিশেষ কয়েকটি দিনেই। কিম্বা পরিবারের সকলে এক হলে এক জন ফটোগ্রাফারকে ডেকে তোলা হত দু’-একটি ফ্যামিলি ফটো। ব্যস, এখানেই শেষ।  তারপর ছবিটা স্বযত্নে তোলা থাকত মূল্যবান অ্যালবামে। মাঝে মাঝে সেগুলি খুলে খুলে দেখা আর দেখলেই মন ভাল হয়ে যাওয়া। সেই অ্যালবামটাই এখন ভার্চুয়াল হয়ে গিয়ে ছবি তোলার জগতে প্রায় বিপ্লব এনে ফেলেছে।

মনোবিদ অনিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে তাই জানতে চাওয়া হয়েছিল, এরকম বাড়াবাড়ি রকমের ছবি নিয়ে পাগলামির কারণ। অনিতা এর জন্য সাফ দায়ী করলেন প্রযুক্তির উন্নতি আর মানুষের মনকে। ‘এখন যা দিনকাল এসেছে প্রযুক্তির জগতে, তাতে ছবি তোলাটা কোনো ব্যাপারই নয়। তাই মানুষ যা কিছুর পারছে, দেদার ছবি তুলছে। তবে শুধুই প্রযুক্তি নয়, এর পিছনে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টরটা হল ভাল থাকার চাহিদা। মানুষ বরাবরই নিজের জগৎটাকে অন্যান্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ভালবাসে। সেজন্যই ছোটবেলায় আত্মীয়দের বাড়ি গেলে তাদের অ্যালবামের ছবি দেখাটা ছিল প্রায় যেন বাধ্যতামূলক। এখন ব্যস্ততার যুগে সেই মেলামেশাটা আর হয় কই? দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে সামাজিকতার জায়গা তো এখন ভার্চুয়াল দুনিয়াই। তাই সবাই নিজের প্রতিটি মুহূর্তের খবর দিচ্ছে ছবি তুলে অন্যদের, অন্যরাও একই পথে হাঁটছে। নিজের ছবিতে যখন এরপর অনেকগুলো লাইক আর কমেন্ট পড়ছে, তখন আখেরে প্রাপ্তি তো নিখাদ ভালোলাগা’, জানাচ্ছেন অনিতা।

তবে এরই সঙ্গে উঠে আসছে আলতো করে একটা অভিযোগ। ‘একালের ছেলেপুলেরা প্রয়োজন অপ্রয়োজনে এত ছবি তোলে যে একটু পুরনো হয়ে গেলে তা আর খুলেও দেখে না। আর ফেসবুকের দৌলতে এদের খানা-পিনা-শোনা সব পাবলিক হয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছেতাই ব্যাপার একদম’, বিরক্তির সুর শোনা গেল বছর বাহান্নর অর্ধেন্দুবাবুর গলায়। এ বিষয়ে মতামত চাইলে জয়পুরিয়া কলেজের সায়ন বলে ওঠে, ‘পুরনোদের এই এক সমস্যা- নতুনকে মানতে পারে না কিছুতেই। ব্যাপারটা খুব সিম্পল। গ্লোবালাইজেশনের যুগে ক্যামেরা এখন প্রায় সবার হাতে। সেগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে তো! আর নিজেকে আমরা সকলেই ভালোবাসি। তাই নিজের তোলা ছবিগুলো একটু ফটোশপ করে ফেসবুকে শেয়ার করে দিই। লাইক বেশি এলে মন তাই ভাল হয়ে যায়’।

অবশ্য শুধুই জেন-ওয়াই নয়, পুরনো প্রজন্মের কিছু মানুষও জীবনে আনন্দ পাচ্ছেন ফেসবুকে ছবি তোলার প্রবণতায়। নিজের জন্মদিনটা প্রায় ভুলতে বসেছিলেন আটাত্তর বছরের মনোরমা দেবী। এ বছরের জন্মদিনে নাতনি সাজি এসে তুলে ফেলল ঠাকুমার দারুণ একটা ছবি। ফেসবুকে আপলোডও হয়ে গেল তা সঙ্গে সঙ্গে। সঙ্গে লেখা, ‘হ্যাপি বার্থ ডে ঠাম্মি’। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠাম্মির জন্য শুভেচ্ছায় ভরে গেল সাজির ফেসবুক ওয়াল। ‘এসব দেখে-শুনে ফোকলা দাঁতে ঠাম্মির সে কি হাসি’, দুষ্টু হেসে বলল সাজি। এই নিখাদ আনন্দের কি কোনও তুলনা হয়? তেমনই পেশায় উকিল রমলা দেবী মতামত দিচ্ছেন ফেসবুকে ছবি তোলার পক্ষেই। ‘আগে যা হতো না, তা হত না! তাই বলে কি যুগের সঙ্গে তাল মেলাব না? ভাগ্যিস বিদেশে থাকা ছেলেটা রোজ ফেসবুকে ছবি আপলোড করে। তাই তো জানতে পারি, ও কী খাচ্ছে ,কোথায় ঘুরছে, কটা বান্ধবী পাতিয়েছে’, স্বস্তির হাসি দেখা গেল রমলা দেবীর মুখে। সঙ্গে তাঁর সংযোজন, ‘কাবুলিওয়ালার কাছে ক্যামেরা ছিল না, তাই! না-হলে কি সে নিজের মেয়ের কালিমাখা হাতের ছাপ নিয়ে ঘুরত’?

অতএব, বাঙালির বর্তমানে ফেসবুকে ফটোগ্রাফির হুজুগ ভালো না মন্দ, দীর্ঘস্থায়ী না ক্ষণস্থায়ী, তা নিয়ে না-হয় পরেই ভাবলেন। আগের দিনের চেয়ে বেশি বার ‘স্মাইল প্লিজ’ শুনে মানুষগুলো হাসতে তো পারছে! কী বলেন?

No comments:

Post a Comment